বাঙালীর ও বাঙলার প্রকৃত ইতিহাস রচনার গুরুত্ব

আমাদের দেশে শিক্ষিত মানুষরা বিদেশী ভাবধারায় প্রভাবিত হওয়াকে সাফল্য বলে মনে করেন। আমাদের ইতিহাস চর্চার সূচনা সাহেবদের হাত ধরে। সাহেবদের বক্তব্যকে সমর্থন ও সুপ্রতিষ্ঠিত করাই ছিল ভারতীয় ইতিহাসবিদদের এতকালের কর্তব্য। স্বাধীন ভারতে বামপন্থী ইতিহাসবিদরা সাহেব ভজনার সঙ্গে রাশিয়া ও চীনের ভাবাদর্শ জুড়ে সাংঘাতিক ককটেল তৈরী করেছেন, যার মধ্য থেকে প্রকৃত ইতিহাস খুঁজে বার করা বেশ কঠিন। এর ওপর আছে বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত ভারতীয় ভিক্ষুক ইতিহাসকার। ভারতকে ছোট করে দেখানায় সাফল্যেই এদের কেরিয়ার গড়ে ওঠে। এই সব উপাদানই আমাদের বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচীর ভিত্তি।

লিখিত মানবেতিহাসের অনুধাবন করলে পরিষ্কার বোঝা যায়, একটি একটি জাতির অভ্যুত্থানের সঙ্গে সঙ্গে সেই জাতির গৌরবগাথা লিখিত হয়েছে বিপুল আবেগ এবং রাজশক্তির উদ্যমকে পাথেয় করে। এই গৌরবগাথাই পরবর্তীকালে লিখিত ইতিহাসের অন্তর্গত হয়ে গেছে। বহু শতাব্দী বা সহস্রাধিক বৎসর পরে এগুলি আর নির্ধারণযোগ্য বা ভেরিফায়েবল থাকে না। তখন যাদের স্বার্থে যেটি ভাল মনে হয় সে রকম পিক অ্যাণ্ড চুজ করে অন্য জাতিগুলি এই ঐতিহাসিক বর্ণনাগুলির ব্যবহার করে। সাধারণ জ্ঞানের বইতে পেন বা কলম আবিষ্কারক রাশিয়ায় একজন রাশিয়ান, ফ্রান্সে একজন ফরাসী এবং চীনে একজন চৈনিকের নাম লেখা আছে এটাই দেখা যায়। পাশ্চাত্য সভ্যতার বর্ণনায় আলেকজাণ্ডার এক দিগ্বিজয়ী মহান সম্রাট, যাঁর মহত্বের উদাহরণ স্বরূপ আরও অনেক কাহিনীর সঙ্গে পরাজিত পুরুরাজকে সসম্মানে মুক্তিদানের প্রসঙ্গও কথিত হয়। কিন্তু ভুুলেও কখনও লেখা হয় না যে সম্মুখ সমরে তিনি কোথায় কোথায় জয়ী হয়ে রাজ্য অধিকার করেছিলেন, এবং কতদিন সেই অধিকার রক্ষা করতে পেরেছিলেন। তিনি যে প্রধানতঃ অগ্নিসংযোগ এবং নির্মম হত্যালীলার সঙ্গে লুঠতরাজ করে বিজয়ের পথে এগিয়েছিলেন তা অনুল্লিখিত থেকে যায়। তাঁর পশ্চাদাপসারণের ব্যাপারে একটি মনগড়া কাহিনী উপস্থাপন করে তা সর্বজনগ্রাহ্য বলে চালিয়ে দেওয়া হয়। এই ধরণের অসংখ্য উদাহরণে পাঠ্য ইতিহাস ভর্তি। দুই আমেরিকার আদি বাসিন্দা প্রায় দশ কোটি মানুষের অধিকাংশকে নৃশংস ভাবে খুন করে উল্লাসের রোল তুলে পশ্চিমী সভ্য মানুষেরা উপনিবেশ স্থাপনের যে মিথ্যা বর্ণনা ইতিহাস বলে চালিয়ে যাচ্ছেন, তার বিরুদ্ধ কণ্ঠগুলিকে সব সময় চেপে দেওয়া হয়েছে। অথচ বহু লিখিত কাহিনী স্থানীয়ভাবে রেড ইণ্ডিয়ান, আজটেক, মায়া প্রভৃতি জনগোষ্ঠীর উপর অত্যাচার ও তাদের সামুহিক নিধনের ঘটনাগুলির মধ্যে দুচারটি প্রকাশ করেছে। জীবন্ত রাজকুমারীকে জ্বালিয়ে দেওয়া, মহিলাদের স্তন কেটে টোবাকো পাউচ করা ইত্যাদি কার্যগুলি কোন পশুর পক্ষেও করা সম্ভব নয়। কিন্তু যাঁরা করেছেন তাঁরাই জগতের নৈতিক আদর্শ বলে প্রচারিত হচ্ছে এবং ভারতের উচ্চশিক্ষিত ঐতিহাসিকেরা সেইগুলির সমর্থনে বহু সহস্র পৃষ্ঠা কালিমালিপ্ত করে চলেছেন। হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে বিশ্ববিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয় ইতাদিতে মোটা মাইনের অধ্যাপক নিয়োগ করে এই মিথ্য শঠ অভিসন্ধিমূলক ইতিহাস পড়ানো হচ্ছে। শুধু জাতীয় আয়ের এক মোটা অংশ অপব্যয় করা হচ্ছে তা নয়, দেশের ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী মানসিকতায় সম্পৃক্ত করে তাদের দেশ সম্বন্ধে উদাসীন অথবা বিরুদ্ধবাদী করে তৈরী করা হচ্ছে।

পূর্ববর্তী অনুচ্ছেদে ভারতের ইতিহাসচর্চা সম্বন্ধে দু একটি প্রয়োজনীয় কথা বলা হলেও প্রকৃত সমস্যার ভয়াবহতা এবং বিপুলতা নিয়ে আলোচনা করা হয়নি। বিশদে বললে সাধারণ মানুষ নিজেদের রাষ্ট্রব্যবস্থা সম্বন্ধে বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়বেন। বাঙালীর ইতিহাস বা পঞ্চগৌড়ের ইতিহাসের কথা ভাবলে ভারতের ইতিহাস সম্বন্ধে ইতিপূর্বে যা বলা হয়েছে সেগুলি তো প্রাসঙ্গিক বটেই, তার ওপরে সহস্রাব্দের মুসলমান ভীতি ও মুসলমান ভাবাদর্শের ব্যাপক প্রচারের ফলে নিরপেক্ষ ইতিহাস চর্চা একেবারেই হয়ে ওঠেনি। তুর্কী সিরাজুদ্দৌলা কেন বাংলার শেষ শ্বাধীন নবাব তা কোন সাধারণবুদ্ধির মানুষ বুঝতে পারবেন না। কিন্তু ঐতিহাসিকদের মতে এই ব্যাখ্যাই সঠিক। সিরাজুদ্দৌলার পতনের পরে যাঁরা এলেন, তাঁরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু সমাজের সমর্থনে ক্ষমতা দখল করে স্বল্পকালে সারা ভারতে ব্যাপ্ত হয়ে ভারতকে ব্রিটিশ রাজত্বের কলোনী বা উপনিবেশে পরিবর্তিত করে ফেললেন। অপেক্ষাকৃত সভ্য প্রকৃতির সাহেবদের মধ্যে দেশীয় জনগণ নিজেদের রক্ষাকর্তা এবং জীবনের আদর্শ খুঁজে পেতে চাইল। সকলের সাহেবভক্তি দেবভক্তির পর্যায়ে উন্নীত হল। ভারতকে, প্রধানতঃ বৃহত্তর বঙ্গদেশকে লুণ্ঠন করে যে প্রভূত সম্পদ ইংরেজরা সংগ্রহ করল, তাই দিয়ে সেখানে এবং পুরো ইউরোপে শিল্পবিপ্লব ঘটিয়ে ইউরোপ এক ধাক্কায় বাকী দেশগুলির তুলনায় বহুদূর এগিয়ে গেল। সোনার দেশ ভারত আধুনিক সভ্যতায় ঋদ্ধ ইউরোপের তুলনায় অতিশয় পশ্চাদপদ, হীন এবং দরিদ্র প্রতিপন্ন হয়ে গেল। ভারতীয়দের এবং বিশেষভাবে বাঙালী ভদ্রসমাজে সাহেবভক্তি, এবং সাহেব হওয়ার প্রাণপণ প্রচেষ্টা প্রবল হয়ে তাদের ঐতিহ্য ও সংস্কারকে গ্রাস করে পূর্বস্মৃতি প্রায় মুছে দিল। ইউরোপের শিল্পবিপ্লবের ফলে উপলব্ধ প্রগতি তাদের সাহিত্য বিজ্ঞান ও ইতিহাস চর্চাকেও প্রচুর পরিমাণে অগ্রসর করে দিল। এই জ্ঞানযজ্ঞের এক অংশ ভারতেও অনুষ্ঠিত হল। ইউরোপীয় ইতিহাসকারেরা ভারতের ইতিহাস অনুসন্ধানে মনযোগী হয়ে, বহু ঐতিহাসিক ঘটনা ও কাহিনীর বিশদ বিবরণী লিপিবদ্ধ করলেন। ইংরেজশাসকের পরিকল্পনা মত ভারতীয় ইতিহাসবেত্তার নূতন দলের জন্ম হল। অনেকাংশে ইংরেজনির্ভর বা অনুসারী হলেও দেশে এবং বিশেষতঃ বঙ্গদেশে প্রকৃত শিক্ষিত, যুক্তিবাদী, বিশ্লেষণক্ষম ঐতিহাসিক চিন্তাশক্তির জন্ম হল। মাতৃভাষায় ব্যাপক ইতিহাস চর্চা প্রধানত এই ইংরেজীশিক্ষিত মানুষদেরই অবদান। তবে একথা অনস্বীকার্য যে এই আধুনিক ইতিহাসবিদগণ পাশ্চাত্য দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে বিশেষ বিচরণ করতে পারেননি। বিশেষত, পৌত্তলিকতা, অস্পৃশ্যতা, হিন্দু উপাসনারীতি, ভারতীয় খাদ্যাভ্যাস প্রভৃতি বিষয়ে পশ্চিমী চশমা দিয়েই তাঁরা দেশকে দেখলেন।

বৃহত্তর বঙ্গদেশ বা পঞ্চগৌড়ের মধ্যযুগের ইতিহাস সাহেবরা ঘটনার বহুযুগ পরে লিখিত কয়েকটি আরবী ফারসী বিবরণীর ভিত্তিতে রি কনস্ট্রাক্ট করলেন। এবং পরবর্তীকালে সেইগুলিকে প্রামাণ্য ইতিহাস বলে চালিয়ে দেওয়া হল। স্বদেশী ইতিহাসকারেরা এই ব্যাপারে পঞ্চমুখ হয়ে এক গৌরবময় মুসলমান শাসনের বহু শতাব্দীর ইতিহাস লিখে ফেললেন। শের শাহ জি টি রোড তৈরি করে ফেললেন, পোষ্টাল সার্ভিসের জনক হয়ে গেলেন, দুবছর রাজত্ব করা কোন পাঠান দস্যুর ডাইনাষ্টির রাজত্বকালের এষ্টিমেট লিখে ফেলতেও ঐতিহাসিকরা কোনরূপ দ্বিধার সম্মুখীন হলেন না। আর সব সুলতান, নবাব, সুবেদার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সদ্ভাবনায় গদগদ হয়ে উঠলেন। মিথ্যার স্বর্গে বাস করতে বাধ্য হলেন কোটি কোটি সাধারণ মানুষ। লীগ সরকার হওয়ার আগের দিন পর্যন্ত বাঙালী নেতৃত্ব এর কিছুই টের পাননি। ঐতিহাসিকরা মুসলিম ডমিন্যান্স এত স্বাভাবিক মনে করতেন, যে তাঁরা এসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু খুঁজে পাননি। স্বাধীনতার পরের দশকগুলিতে পূর্ববঙ্গের মানুষেরা অধিকাংশই ভারতে চলে এলেন। তাঁদের বিতাড়নের কারণ নিয়ে আজ পর্যন্ত কেউ মুখ খোলেননি। কত লক্ষ মানুষ পূর্ব পাকিস্তানে নিহত হয়েছেন তার কোন হিসাব রাখাারও কোন প্রয়াস কেউ করেননি। ঐতিহাসিকরা মৌনী বাবার চরিত্র অভিনয় করে ফ্যাশনেবল সেকুলার প্রোগ্রেসিভ জেণ্টলম্যান হয়ে আত্মগোপন করলেন। আবার এই বিতাড়িত মানুষেরাই ছলে বলে ক্ষমতা দখল করে তাঁদের জনগোষ্ঠীর নিদারূণ দুর্দশার কারণগুলি লুকিয়ে ফেলতে অত্যন্ত সক্রিয় হয়ে উঠলেন। সারা ভারতে কালে কালে জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী সেকুলারিজম বা হিন্দু বিদ্বেষের সৃষ্টি করা হল। রাজনৈতিক নেতারা তাৎক্ষণিক স্বার্থের কারণে এই কাজে ব্রতী হলেন। ঐতিহাসিকরা বিদেশী প্রভুদের প্রচারিত হিন্দু বিদ্বেষ এবং পরবর্তীকালে মিশনারীদের উৎসাহে কৃত ধর্মান্তরীকরণের সমর্থনে লিখতে আরম্ভ করলেন।

এতগুলি প্যারাগ্রাফ লিখেও কোন বাঙালী বুদ্ধিজীবির ওপর তা প্রভাব ফেলতে পারে এই আশা অতি বড় মূর্খও করবে না। তবে প্রচেষ্টা ছেড়ে দেওয়াটা ঠিক নয়। জাতীয় ও আঞ্চলিক স্তরে সমাজের মর্যাদারক্ষার জন্য যে সত্যগুলিকে সামনে আনা দরকার, ক্ষুদ্র হলেও সমাজের এক অংশের মধ্যে সেই প্রচেষ্টা দেখতে পাওয়া যাবেই। সেই সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর মানুষদের উৎসাহিত করতে এবং তাদের ভাবধারায় অনুপ্রেরিত ঐতিহাসিকদের সত্য ইতিহাস রচনা করতে উদ্বুদ্ধ করার জন্যই 'রাইট হিষ্টোরী' বা ইতিহাস লিখুন ওয়েবপেজটির সৃষ্টি করা হল। আমাদের নিজেদের ইতিহাস নিজে লিখতে হবে। এবং সেই ইতিহাস প্রকৃত ইতিহাস হবে। মিথ্যা প্রোপাগ্যাণ্ডা নয়। এর জন্য প্রয়োজন প্রচুর গবেষণা, গভীর দেশভক্তি এবং ব্যক্তিগত স্তরে সত্যনিষ্ঠা। আজকের সামাজিক পরিস্থিতিতে এই ইতিহাস রচনায় সরকারী বা প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা পাওয়া যাবে না বললে ভুল হবে না। অথচ এই বৃত্তের বাইরে পেশাদার ঐতিহাসিক পাওয়া শক্ত। তাই বিভিন্ন পরিমণ্ডলে কর্মরত ও সেবানিবৃত্ত শিক্ষিত মানুষদের সহযোগিতায় ও অংশগ্রহণে প্রায় দেড়শো বিষয় বা ঘটনার ওপর প্রবন্ধ লেখার একটি প্রচেষ্টা এই ওয়েবপেজের মধ্য দিয়ে আরম্ভ করা হচ্ছে। বাঁদিকের লিঙ্কগুলিতে কয়েকটি দলে ভাগ করে এই বিষয়াবলীর প্রাথমিক বর্ণনা দেওয়া হবে। আমাদের প্রথম কর্তব্য হল, এই বিষয়গুলির পরিমার্জন বা প্রয়োজনে সরলীকরন। তার পরে এই সব বিষয়ে আগ্রহী ব্যক্তিদের দ্বারা প্রবন্ধ লেখানো। প্রয়োজনে সম্মান দক্ষিণাও দেওয়া হবে।