ইংরাজী ভাষার গুরুত্ব

আমাদের দেশে শিক্ষিত মানুষ বলতে তাদেরই বোঝায়, যারা গড়গড় করে ইংরেজী বলতে পারে। অন্যান্য মানদণ্ড অনেক শিথিল করা যেতে পারে, কিন্ত ইংরেজীর জ্ঞান কোনমতেই কম হলে চলবে না। এর ওপর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নামের গুরুত্বও অপরিসীম। প্রকৃতপক্ষে ভারতে শ্রেণী বৈষম্যের মূল ভিত্তিটিই হল আংরেজীয়ানা বা সাহেবী চাল। তার আবার প্রধান উপাদান ইংরেজী বুলি। কর্মক্ষেত্রে ইংরেজী লেখার যোগ্যতাই প্রধান যোগ্যতা। এই ইংরেজীই 'আমরা' ও 'ওরা' এই দুই শ্রেণী বিভাগের ভিত্তি।

ইংরেজী ভাষার ব্যবহারিক প্রয়োজন এবং উচ্চশিক্ষার জন্য জ্ঞানভাণ্ডারের আকর হওয়ার ব্যাপারটি বিতর্কের ঊর্ধ্বে। উচ্চশিক্ষায় সাফল্যলাভের জন্য ইংরেজী ভাষায় দক্ষতা অর্জন আবশ্যিক। ভাল ইংরেজী জানলেই তবে ইংরেজী ভাষায় লেখা বইপত্র তরতর করে পড়া এবং সঙ্গে সঙ্গে বোঝা সম্ভব। পড়তে পড়তে যদি অনেক অজানা কথা সামনে আসে, বা স্টাইল বা শৈলীগত প্রয়োগের ব্যঞ্জনা পরিষ্কারভাবে বোঝা না যায়, তবে পড়ে কোন লাভ হয় না। যদিও এক বিশাল অংশের ছাত্রছাত্রীরা মুখস্থ করে সেটিকে মোটামুটি খাতায় বিশ্বস্তভাবে অনুলিখন করতে সমর্থ হয় বলে তাদের প্রকৃত সীমাবদ্ধতা ধরা পড়ে না। ভাল ইংরেজী জানা ব্যাপারটি কি তা সম্বন্ধে অধিকাংশ মানুষের পরিষ্কার ধারণা নেই। তবে একটি অবধারণা সমাজে বহুল প্রচলিত। তা হল 'ইংলিশ মিডিয়াম' স্কুলে না পড়লে ভাল ইংরেজী শেখা সম্ভব নয়। এটি সত্য হলে চল্লিশ বছর পূর্বেকার সকল ইংরেজী শিক্ষিত মানুষ যারা মাতৃভাষার মাধ্যমে বিদ্যাশিক্ষা করেছিলেন, তাঁরা বিফল হতেন। প্রকৃতপক্ষে ব্যাপারটি ঠিক উল্টো। সাম্প্রতিককালের 'ইংলিশ মিডিয়াম' স্কুলে পড়া ছাত্রদের অনেকেরই ইংরেজী ভাষায় দখল নেই। তাদের গভীরতা কম। বোর্ডগুলি ক্রমাগত গ্রামার কমিয়ে ও এম ষি কিউ প্রশ্ন করে এদের সর্বনাশ করেছে। এরা শেষ পর্যন্ত 'হিংলিশ' নামক বকচ্ছপ ভাষায় কাজ চালায়। মেল চিঠিপত্র অতি সংক্ষেপে সারে যাতে একস্পোজড না হয়ে যায়। যে কোন মাল্টিন্যাশনাল ও আই টি কোম্পানিতে গেলে দেখা যাবে সবাই হিন্দিতে কথা বলছে। মাঝে মধ্যে দুচারটি ইংরেজী স্ল্যাং এর ফোড়ন।

'ইংলিশ মিডিয়াম' ব্যাপারটি প্রধানতঃ সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় ক্রিশ্চান মিশনারীদের অবিরাম প্রচারের ফলে সমাজে অবাঞ্ছিত মান্যতা পেয়ে গেছে। অর্ধশিক্ষিত রাজনেতাগণ তাঁদের ছেলেপিলে দের কখনই মাতৃভাষার মাধ্যমের লেখা পড়া শেখান না। তাঁরা যে 'এলিট'। এর ফলে সমাজে একটি ধারণা দৃঢ়মূল হয়েছে, যে 'ইংলিশ মিডিয়াম' স্কুলে পড়লে ইংরেজী মাতৃভাষা হয়ে যায়; এবং ছাত্রছাত্রীরা বিলেতের লোকেদের মত সমান সাবলীলতায় ইংরেজী শিক্ষিত হয়ে ওঠে। ব্যাপারটি একেবারেই সত্য নয়। মাতৃভাষা মানে মায়ের বা বাবার বা পরিবারের ব্যবহৃত ভাষা নয়। মাতৃভাষা হল সেই সব শব্দ, বাক্য ও শব্দসমষ্টির যোগফল, যা একটি শিশু মোটামুটি সাত আট বছর বয়স পর্যন্ত শুনতে পায়। কলকাতায় অবাঙালী প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হবার পারে এখানকার মাতৃভাষা খিচুড়ি হয়ে গেছে। বোম্বে শহরের অবস্থা আরও করুণ। তাই কয়েকজন ম্যাডামের রক্তচক্ষু, চাপা হুঙ্কার আর গার্জেন কল করে টেররাইজ করার পদ্ধতিতে মাতৃভাষা ইংরেজীতে পরিবর্তিত হতে পারে না। প্রকৃতপক্ষে মানুষের মস্তিষ্কে বিভিন্ন ভাষা বা তাদের রিসোর্সেস আলাদা আলাদা ভাবে সঞ্চিত করে রাখার কোন ব্যবস্থা নেই। গুরুমস্তিষ্কের এক বৃহৎ অংশ ল্যাঙ্গোয়েজ বা হিউম্যান কমিউনিকেশন করার জন্য ব্যবহৃত হয়। স্তরে স্তরে এখানে ভাষা বা অভিব্যক্তি সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য সঞ্চিত হয়। যখন মস্তিষ্কের এক ক্ষুদ্র অংশই আকার ধারণ করেছে, সেই শিশুকালেই এই সব তথ্য সর্বাধিক গুরুত্ব নিয়ে সঞ্চিত হয়। এর একটা বড় অংশ মানুষের 'বিহেভিয়ারাল' প্যাটার্ণ নির্ধারণ করে। মস্তিষ্ক বয়সের সঙ্গে আকারে বাড়তে থাকে। ভাষা সংক্রান্ত সঞ্চয়ের ক্যাপাসিটি বা ক্ষমতাও দ্রুত বাড়তে থাকে। এই বয়সে শিশুরা যা শোনে তাই মনে রাখে। তাদের ধরে নেওয়ার ক্ষমতাও খুব বেশী হয়। কিন্তু বয়সের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান মস্তিষ্ক বাড়ে লেয়ারে লেয়ারে বা স্তর হিসাবে। সবার নীচে এবং মস্তিষ্কের সার্চ প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে সহজলভ্য অংশ হল শিশুকালের ইনার লেয়ারগুলি। ওপরের স্তরগুলিতে যে সব তথ্য সঞ্চিত হয় তার অধিকাংশই এই ইনার লেয়ারের অ্যাসোসিয়েটিভ বা সংশ্লিষ্ট তথ্য হিসাবে।

তাই মানুষ ইচ্ছা করলেই ভাষার সঞ্চয়ব্যবস্থা পরিবর্তন করতে পারে না। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের অভিব্যক্তি সে যে ভাষাতেই প্রকাশ করতে চাক, তা তার শৈশবের সঞ্চিত তথ্যগুলির সংশ্লিষ্ট তথ্য হিসাবেই মস্তিস্ক প্রসেস করবে। বহুবছর ইংরেজী শেখার পরেও ইংরেজী বাক্যের ডেলিভারী সেই কোর বা প্রাথমিক মস্তিস্কের সাহায্য নিয়েই করাা সম্ভব। কার্যতঃ এ এক ধরণের ট্রানস্লেশন, যেখানে মাতৃভাষায় ব্যাপারটি বুঝে তার ইংরেজী বা অন্য ভাষায় বলা হয়। তবে এক দেড় বছর বয়স থেকে ক্রমাগত ইংরেজী শব্দ ও বাক্য শুনিয়ে মাতৃভাষাকে ভুলিয়ে দেবার প্রচেষ্টা শিশুর প্রাথমিক মস্তিষ্কের একটা অংশ এদের দখলে এনে দেয়। তথাকথিত 'ইংরেজী মাধাম' শিক্ষাব্যবস্থার প্রধান লক্ষ্যগুলির মধ্যে একটি হল মাতৃভাষা ও নেটিভ সমাজের সংস্কৃতিকে ইরেজ করে ফেলা। অর্থাৎ ক্রিত্রিমভাবে মানুষের প্রকৃতিকে পরিবর্তিত করে তার আত্মসম্মানের সর্বনাশ করা। তবুও পুরো সাহেব তৈরি হয় না। ভাত মাছ ডাল গুড় সন্দেশ কত কি রেসিডিউ থেকে যায়। বাঙালী সাহেব না হয়ে হয়ে যায় 'বঙ'। অর্থাৎ সাহেবের বাঙালী ক্যারিকেচার। কয়েক লক্ষ টাকা খরচ করে মফঃস্বলের এক অভিভাবক ব্রিটিশ ইনস্টিটিউটের ইংরেজী শিক্ষককে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ছেলের ইংরেজীতে প্রফিসিয়েন্সি কেন এল না। শিক্ষক বললেন বেস তৈরী করে দিয়েছি। নাও হি হ্যাজ টু থিংক ইংলিশ। ইংরেজী সিনেমা দেখতে হবে, ইংরেজি বই পড়তে হবে, ইংরেজী খবরের কাগজ ছাড়া অন্য কাগজ পড়া চলবে না। আর ইউ টিউবে ভিডিও দেখে উচ্চারণ ইত্যাদি রপ্ত করতে হবে। অর্থাৎ ইংরেজী শেখায় প্রয়াসে জীবনের বাকী প্রতিটি পল সে ওই বিদেশী ভাষার মধ্যে ডুবে থাকবে।

ইংরেজী ভাষাটিও সরল বা সহজ নয়। সমারসেট মম বলেছিলেন "English grammar is very difficult and few writers have avoided making mistakes in it. ..... It is necessary to know grammar, and it is better to write grammatically than not." ইংরেজী ভাষা কঠিন হওয়ার প্রধান কারণ হল এর শব্দভাণ্ডার, যার আশি শতাংশই বিদেশী। এগুলির এক তৃতীয়াংশ ভারতীয়। এই সব বিদেশী শব্দকে তাদের পরিবেশ বা কন্টেক্সট ছাড়াই গ্রহণ করা হয়েছে। পরে গোঁজামিল দিয়ে গ্রামার লিখে সেগুলির ব্যবহার নিয়ন্ত্রিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। ফলে গ্রামারের মধ্যে 'রুল' বা নিয়মের প্রাধান্য না থেকে 'ইউসেজ' বা প্রয়োগের উদাহরণ মেনে চলার নির্দেশই বেশী। তাই এই সব নিয়ম ও ব্যতিক্রম চোখ বুঁজে মুখস্থ করা ছাড়া গত্যন্তর নেই। গ্রামার আয়ত্বে এলে বাকী প্রসঙ্গ আলোচিত হতে পারে। আমারা 'ইংলিশ লার্ণিং' এর সীমিত পরিসরে উচ্চশ্রেণীর বিদ্যালয় ছাত্রছাত্রীগণ, কলেজে পাঠরত শিক্ষার্থীগণ, এবং কর্মজগতে প্রবিষ্ট সকল মানুষের কথা মনে রেখে তারা যাতে ইংরেজীতে স্বনির্ভর হতে পারে সেই ধরণের অতি প্রয়োজনীয় 'কনটেণ্ট' গুলি সাধারণ্যে প্রকাশ করছি। এই গুলি আয়ত্ব করতে পারলে লেখার ব্যাপারে কোন অসুবিধা হবে না। বলতে গেলে প্রথমে চাই কনফিডেন্স। লজ্জা করলে হবে না। অ্যাকসেণ্ট বাঙালী অ্যাকসেণ্টই চলবে। তবে 'অ' কে 'ও' এবং 'অ্যা' কে সর্বত্র 'আ' বলার মত অবিমৃষ্যকারিতা চলবে না। পরবর্তীকালে পাঠকদের ফীডব্যাক থেকে আরও উন্নতি সাধন করা সম্ভব হবে। এই উদ্যোগের সাফল্য পাঠকদের সিন্সিয়ারিটি বা মনোযোগের ওপর নির্ভর করে। কোন কুইকফিক্স সল্যুশন নেই।