স্বাস্থ্যই সম্পদ : শরীর ও মন সুস্থ রাখুন

স্বাস্থ্য নিয়ে চিন্তা আমাদের সকলেরই আছে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমরা অন্যের মতামত বিশেষত ডাক্তারদের মতামতকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকি। এইভাবে নিজেদের করণীয় সম্বন্ধেও কিছুটা উদাসীন হয়ে পড়ি। নীরোগ শরীরই স্বাস্থ্যচর্চার প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। রোগ না হলে আমরা ডাক্তারদের কাছে যাই না। তখন কিন্তু শরীর আর নীরোগ নেই। শরীরকে নীরোগ রাখতে হলে নিজেদের সচেতন হতে হবে। দৈনন্দিন অভ্যাস ও জীবনযাপনের মধ্য দিয়ে শরীরকে বলিষ্ঠ ও সুস্থ রাখতে হবে। এতে ডাক্তারের পরামর্শ অত্যন্ত প্রয়োজন না হলে লাগার কথা নয়।

শরীর সম্বন্ধে সম্যক ধারনা না থাকলে শরীরের যত্ন করা সম্ভব নয়। দেহকে ভালভাবে জানা বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও দেহগত প্রক্রিয়ার সম্বন্ধে পরিষ্কার ধারনা থাকলে তবেই সেগুলি ঠিকমত কাজ করছে কি না, বা কোথায় অসুবিধা হচ্ছে তা বোঝা সহজ হয়ে যায়। আমাদের অনেকেরই ধারনা, শরীর যন্ত্রটি অতিশয় জটিল, সাধারণ মানুষ তো দূর, এমনকি ডাক্তারদেরও এটি পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়। ব্যাপারটি ভেবে দেখলে আমরা আমাদের মতো করে বুঝে নেওয়ার কথা চিন্তা করতে পারি। যে রেলগাড়িতে চড়ে তার গাড়িটির নির্মাণে যে তথ্য প্রয়োজন, সেই জ্ঞানের কোন দরকার নেই। তার প্রয়োজন গাড়িটির যাত্রীবহনের ব্যবস্থা, দরজা-জানালা, বসার আসন, ফ্যানের সুইচ ইত্যাদি বস্তুর সম্বন্ধে ধারনা। সুস্থ জীবন যাপনের জন্য আমাদের শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলি কি ভাবে কাজ করে মোটামুটি সেই জ্ঞান থাকলেই চলবে। এই বিষয়গুলি বিদ্যালয়ে নীচু ক্লাসেই পড়ানো হয়, এবং সকলেই ভালভাবেই অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ও শারীরিক ক্রিয়ার বিবরণগুলি ভালভাবেই অনুধাবন করতে পারে।

হাইজিন বা স্বাস্থ্য বিভাগে মানবদেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলির সম্বন্ধে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষদের যে জ্ঞান থাকা দরকার তা চিন্তা করেই অ্যানাটিমির কিছু অংশ সরলিত আকারে উপস্থাপন করা হচ্ছে। সাধারণভাবে এগুলি সাধারণ মানুষের জানা বিষয় তবে একসঙ্গে দেখতে পেলে সব মনে পড়ে। পুরানো বিদ্যা ঝালিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়। তার পরেই আসে এগুলির কাজ বা ফাংশন বা ইউজ জাতীয় আলোচনা। কাজ বা ইউজ জানার পরেই ওঠে অ্যাবিউজ বা অপব্যবহার নিয়ে আলোচনা। ক্ষতিকারক যে সব দ্রব্য বা অভ্যাস এগুলিকে নষ্ট করতে পারে সেগুলি সম্বন্ধে বিশদে জানা দরকার। যে কোন যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু ইন্ধন জোগালেই দেহযন্ত্র গড়গড় করে চলবে এ কথা ভাব ঠিক নয়। ইন্ধনটি তার আরব্ধ কাজ করতে পারবে যদি যন্ত্রটি সুস্থ বা কর্মক্ষম থাকে। সে জন্য শরীরের যত্ন গ্রহণ করা আমাদের প্রাথমিক কর্তব্য। আর এই জন্যই অনেক বিষয় ও বস্তু নিয়ে বিশদ আলোচনা করা হবে।

মানবদেহের রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রথমজীবনের বৃদ্ধির জন্য মূলতঃ খাদ্যেরই প্রয়োজন। আমরা শরীরকে দিয়ে যে সব কাজ করাই সেগুলি সম্পন্ন করার জন্য যে শক্তির প্রয়োজন তা খাদ্য থেকেই উৎপন্ন হয়। তাই খাদ্যের পরিমাণ ও গুণাগুণ সম্বন্ধে ধারনা তৈরী করা সকলেরই কর্তব্য। এটা ঠিক যে জীবনযাত্রা নির্বাহের সঙ্গে সঙ্গে কিছু পরিমাণ শিক্ষা স্বাভাবিকভাবেই হয়ে যায়। বৎসরের পর বৎসর খাদ্য গুলি ভোজন করার সময় তার স্বাদ, গন্ধ, পৌষ্টিক গুরুত্ব, পরিপাকের সুবিধা অসুবিধা, ইত্যাদি বিষয়ে অনেকটাই জানা হয়ে যায়। তবে যত ভাল করে জানা যাবে তত সুচারুরূপে এই খাদ্যগুলিকে শরীরের উন্নতিসাধনের জন্য এবং সুস্থ দীর্ঘজীবন লাভের জন্য ব্যবহার করতে সুবিধা হবে। সময়ের সঙ্গে খাদ্যের প্রস্তুত প্রণালীতে বেশ কিছু পরিবর্তন ঘটানো হয়েছে। ব্যবসায়িক কারণে এবং কিছুটা মানুষের ক্রম হ্রসমান কর্মবিমুখতার জন্য নিজের সংসারে প্রস্তুত খাদ্যের বিকল্প বাইরের রেস্টুরেণ্টে খুঁজছে অনেকে। এ ছাড়া জাঙ্ক ফুড বা প্রি-প্যাকড কুকড্ বা সেমি-কুকড্ ফুড অতিশয় জনপ্রিয় হয়েছে। মিডিয়ার ব্যাপক প্রসার এবং বিজ্ঞাপণের কল্যাণে মানুষের স্বাভাবিক বিচারবুদ্ধি অত্যধিক প্রভাবিত হয়ে খাদ্যের গুণাগুণ বিচারের ক্ষমতা কার্যতঃ লোপ পেয়েছে।

খাদ্যের পর শরীরের যত্নগ্রহণে সর্বাধিক গুরুত্ব ব্যায়ামের। দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন কাজে আমরা যে অঙ্গসঞ্চালন করি তাও ব্যায়ামের কাজ করে। বলা ব্যহুল্য ব্যায়াম করতে গেলে দেহের গঠন ও বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের বৈশিষ্ট্য সম্বন্ধে জ্ঞান থাকতে হবে। না হলে কি ধরণের অঙ্গসঞ্চালন বা ভার বহনে অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলির বৃদ্ধি বা সুন্দর গঠন হতে পারে তা বোঝা সম্ভব নয়। ব্যায়াম নিজেই একটি বৃহৎ বিষয়। এই ক্ষুদ্র পরিসরে তার আলচনা করা হবে না। তবে ব্যাপারটি অতি প্রয়োজনীয় বলে এখানে উল্লিখিত হল। শরীরের গঠনতন্ত্র বোঝার পর আমাদের মনোযোগ দেওয়া উচিত শরীরের পুষ্টি বা লালনপালনের জন্য। পুষ্টি প্রধানতঃ খাদ্যের মাধ্যমে হলেও পরিবেশ বা পারিপার্শিকও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অবশ্যই অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পরিবেশ আমাদের হাতে থাকে না। সমাজের অবস্থার উপর তা অনেকাংশে নির্ভরশীল। তবে যে ব্যাপারটি আমাদের হাতের মধ্যে আছে, এবং যা নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে সুস্থ থাকার সম্ভাবনা অধিক, তা হলো দৈনন্দিন জীবনের ব্যক্তিগত অভ্যাসগুলি। সুস্থ থাকতে হলে সুন্দর লিভিং হ্যাবিটস বা জীবনশৈলীর আবশ্যকতা অস্বীকার করা যায় না। বহু ব্যক্তিগত অভ্যাস স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে। অনেকগুলি আবার বিপজ্জনক। তাই এই সম্বন্ধে বিশদ আলোচনা এই পরিসরে করা হবে।

বলা বাহুল্য যে যে কনটেণ্ট বা বিষয়াবলী নিয়ে এই বিভাগের প্রারম্ভ করা হল, তা কালের সঙ্গে পরিবর্তিত হবে, পরিবর্ধিত হবে। মানুষের প্রয়োজন বুঝে আরও বহু বিষয়ের তথ্যাবলী সংগ্রহ করে সেগুলিকে পরিবেশন করাই আমাদের উদ্দেশ্য। মনে রাখতে হবে, জীবনের মান দেহের উপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। সময়ের একাংশ এই কারণে ব্যয় করতে কুণ্ঠাবোধ করলে চলবে না। বরং এটিকে উচ্চ প্রাথমিকতা দিতে হবে।